ফিরে আসুক মুশফিকের সেই হাসি

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৫৮ পিএম

Runner Media

ডেস্ক রিপোর্ট

 

হঠাৎ মুশফিককে নিয়ে আলোচনা তাঁর একটা সিদ্ধান্তের কারণে। নিউজিল্যান্ড সিরিজ শেষ। ৩ অক্টোবর ওমানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে অল্প কয়টা দিনেরই বিরতি। মুশফিক পারতেন ঢাকার যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে বগুড়ার মাটিডালির বাড়িতে গিয়ে কয়টা দিন নিরিবিলি কাটাতে। তিনি পারতেন সময়টা শুধুই স্ত্রী-সন্তান-পরিবারের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। বিশ্রাম নিয়ে বিশ্বকাপের জন্য সতেজ হতে।

সেসবের কিছুই না করে মুশফিক সিদ্ধান্ত নিলেন খেলার। জাতীয় দলের খেলা নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটও নেই, তাতে কি! ‘ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়।’ চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ‘এ’ দল সিরিজ খেলবে বিসিবি হাই পারফরম্যান্স দলের বিপক্ষে। সেখানেই এ মাসের শেষ দিকে ‘এ’ দলের হয়ে দুটি ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলবেন মুশফিক।

কেন তাঁর এমন সিদ্ধান্ত, সেটি নিশ্চয়ই বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক কারণে জিম্বাবুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ দুটি খেলতে পারেননি। নিউজিল্যান্ড সিরিজে যা-ও খেললেন, ব্যাটে পাননি রানের দেখা। সেটি নিয়েও অবশ্য মুশফিকের বিচলিত হওয়ার কারণ ছিল না। মিরপুরের ব্যাটিং-নরকে এই দুই সিরিজে কেই-বা রান করেছেন!

কিন্তু মুশফিক বিচলিত হলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে একেবারে খালি হাতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আত্মবিশ্বাসের সলতেতে আলো জ্বালতে চাই কিছুটা হলেও জ্বালানি। ‘এ’ দলের হয়ে ম্যাচ দুটি খেলে যদি গোটা দুই ফিফটিও পাওয়া যায়, মন্দ কি!

সত্যি বলতে কি, ফিফটিরও দরকার নেই। একটা নিখুঁত কাভার ড্রাইভ, সুযোগমতো ডাউন দ্য উইকেটে এসে একটা ছক্কা, অথবা ধরুন প্রিয় শট সুইপ খেলেই স্কয়ার লেগ দিয়ে উড়িয়ে বার দুয়েক বলটা মাঠের বাইরে পাঠালেন মুশফিক। নিজেকে ফিরে পেতে তাঁর মতো ব্যাটসম্যানের এর বেশি কিছু আসলে লাগেই না। কখনো কখনো নড়বড়ে একটা ফিফটির চেয়েও ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাসে বেশি টোকা দিয়ে যায় ব্যাটের হৃদয় ছুঁয়ে আসা ও রকম এক-দুটি শট।

ওমানে যাওয়ার আগে মুশফিক চট্টগ্রামে যাবেন হয়তো সে রকম কিছুরই সন্ধানে। হয়তো ব্যাটের বুক থেকে ভেসে আসা ও রকম কিছু ঠকঠক শব্দ কর্ণকুহরে বয়ে নিয়েই তিনি বিশ্বকাপে যেতে চান। সত্যিকারের ব্যাটসম্যানের রান তো আর ব্যাটে থাকে না। থাকে তাঁর মনে, সাহসে, ইন্দ্রিয়ে। ব্যাট সেই রানটাকে অঙ্কের ভাষা দেয় মাত্র।

ক্রিকেটে ‘প্রসেস’ বা ‘প্রক্রিয়া’ শব্দটার বহুল ব্যবহার আছে। সবাই যে সব সময় সব প্রক্রিয়া মানেন, তা নয়। তবে মুশফিক ব্যতিক্রম। তাঁর ক্রিকেটীয় জীবনটা বরাবর প্রক্রিয়ার ব্র্যাকেটেই বন্দী এবং সেই প্রক্রিয়া তাঁর নিজেরই সৃষ্টি। খেলাটাকে অগ্রাধিকার দিয়েই মুশফিকের জীবনের বাকি সবকিছু।

দলের অনুশীলনের পর বাড়তি অনুশীলন এবং তারও পরে যদি করার আরও কিছু থাকে, সেসবও করে নেওয়া, এতেও মন না ভরলে ছুটির দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে-মাঠে কাটাও। শরীরটাকে মেদহীন রাখতে মাঠে চক্কর দেওয়া, জিম, দৌড়-ঝাঁপ তো আছেই। ক্রিকেটার মুশফিকের প্রক্রিয়ার এই হলো সারাংশ। কে জানে তাঁর অভিধানে ‘বিশ্রাম’ শব্দটার প্রতিশব্দ ‘পরিশ্রম’ই কি না!

এত পরিশ্রমের পর যদি দু-একটা ইনিংসে ব্যাট থেকে রান ছুটে যায় যাক না! এটা আমার-আপনার দর্শন হতে পারে, মুশফিকের নয়। তাঁর কাছে ব্যাপারটা পুরো উল্টো-আরে, আমি এত পরিশ্রম করছি, তা-ও কেন বলের লাইন মিস হবে, সুইপ শট ব্যাটে না লেগে প্যাডে লাগবে! ‘এ রকম কেন হলো’-নিজেকে তেমনই এক কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়ে মুশফিক আবার নেমে পড়েন ব্যাটের ধার বাড়াতে।

যতক্ষণ না ব্যাটের সেই ধার খারাপ সময়ের কুণ্ডলীটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে, ততক্ষণ তাঁর কাছে যাবেন না যেন! মুখে কিছু না বলুক, অগ্নিদৃষ্টিতেও ভস্ম হয়ে যেতে পারেন। মুশফিকের সতীর্থদের কাছেই শোনা, তাঁর ও রকম সময়ে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কতটা ভারী থাকে। অন্তত তাঁর আশপাশের পরিবেশ তো বটেই। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুম এটা মেনে নিয়েই মুশফিকের জন্য নীরবতার সীমাটা বাড়িয়ে রাখে। অতি কোলাহলে না আবার তাঁর চিন্তার সুর কেটে যায়!

কিন্তু হাতের ব্যাটটা যখন কথা শুনতে শুরু করে, রানের প্রবাহে খলখলিয়ে হেসে ওঠে, মুশফিকের মধ্যে তখন দেখতে পাবেন প্রাণের উচ্ছ্বাস। সারল্য মাখা ভুবন ভোলানো হাসি। যেন জীবন মানে দারুণ সব শটের মালা গাঁথা আনন্দময় এক বড় ইনিংস! সেখানে খারাপ সময়ের চোরাবালি বলে কিছু নেই। বলের লাইন মিস করার আক্ষেপ অনুপস্থিত।

চট্টগ্রামে ফিরে আসুক মুশফিকের সেই হাসি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে ভেসে বেড়াক আনন্দের বাতাবরণ।

আর এম/এম.জে